Promises

ভাইটামিন-সিঃ ক্যান্সারের প্রাচীন প্রতিষেধক

আমেরিকান ক্যান্সার সোসাইটির হিসাব মতে শুধুমাত্র আমেরিকাতে ২০১৬ সালে সাম্ভাব্য নতুন ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা হবে ১,৬৮৫,২১০ জন, যার মধ্যে ক্যান্সারের কারণে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াবে ৫৯৫,৬৯০ জন। এই সংখ্যা বিভিন্ন বছর ভিন্ন হয়, বিভিন্ন দেশে এই পরিসংখ্যান ভিন্ন হয়। এমনকি ভিন্ন জেনেটিক ও ভৌগলিক কারণে বিভিন্ন ক্যান্সারের প্রকোপ ভিন্ন হতে দেখা যায়। প্রতি বছর ক্যান্সার নিরাময়ে অনেক অর্থ ব্যয় হচ্ছে। ২০১১ সালের আমেরিকার ন্যাশনাল ক্যান্সার ইন্সটিটিউট রিসার্চ পোর্টফোলিও থেকে জানা যায় স্তন ক্যান্সারে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করা হয়- যা ৬০০ মিলিয়নের বেশি। অন্য আরো চারটি ক্যান্সারের গবেষণায় 2০০ মিলিয়নের বেশি অর্থ ব্যয় করা হয়েছে সেগুলো হল- ফুসফুস, প্রস্টেট, কোলন/রেক্টাম (মলাশয়) ও লিউকেমিয়া (রক্তের ক্যান্সার)।  তারা  ২০১৬ সালে ক্যান্সার গবেষণায় ৫ বিলিয়নের বেশি অর্থ ব্যয় করছে যা বেড়ে ৬ বিলিয়ন ছাড়িয়ে যাবে ২০২২ সালে। (এটা শুধু আমেরিকা বা একটা প্রতিষ্ঠানের তথ্য, সারা বিশ্বের পরিসংখ্যান তার চেয়ে হাজার গুন বেশি হবে)

এসব পরিসংখ্যান থেকে ধারনা পাওয়া যায় ক্যান্সার গবেষণা কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে সাম্প্রতিক সময়ে- এটাই উদ্দ্যেশ্য সকল ধরনের ক্যান্সারের কার্যকরি প্রতিষেধক তৈরি করা। গত ৫০ বছরে ক্যান্সার গবেষনা অনেক এগিয়ে গেলেও স্তন, ফুসফুস বা, কোলন ক্যান্সারে লক্ষ লক্ষ মানুষ এখনো মারা যাচ্ছে। অন্যদিকে টেরি ফক্স ১৯৮১ সালে মারা যান হাড়ের ক্যান্সারে (osteosarcoma) এবং ক্যান্সার ধরা পড়ার পর তার ডান পা কেটে ফেলতে হয়। গবেষকদের দাবি টেরি ফক্স যদি বর্তমান সময়ে জন্ম গ্রহণ করতেন তাহলে তাকে পা হারাতে হতনা বা হয়তো তাকে ক্যান্সারে ২৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরন করতে হতনা। বর্তমানে ৮০% হাড়ের ক্যান্সারের রোগী চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ হতে পারে। (কানাডায় ব্রিটিশ কলম্বিয়ায় জন্মগ্রহণকারী টেরি ফক্স ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে পা হারানোর পর ক্যান্সার গবেষণায় অর্থের সংগ্রহের জন্য একটা নকল পা নিয়ে ১৪৩ দিনে ৫,৩৭৩ কিমি দৌড়েছিলেন। যার ফলে ১৯৮১ সালে প্রায় ৬০ টি দেশ থেকে ৬৫০ মিলিয়ন ক্যানাডিয়ান ডলার সংগ্রহ করেছিলেন- যা এখনো ক্যান্সার গবেষণার জন্য একদিনে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি অর্থ সংগ্রহের রেকর্ড।)

এখন পর্যন্ত ক্যান্সারের অসংখ্য প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়েছে, যার বেশিরভাগেরই রয়েছে অনেক সীমাবদ্ধতা যেমন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, বিষাক্ততা, স্বল্প সময়ের সমাধান, খরুচে, জটিল চিকিৎসা পদ্ধতি, দূর্বল কার্যকরিতা ইত্যাদি। তাই গবেষকরা সাম্প্রতিক সময়ে ভাবছে ক্যান্সারের প্রাকৃতিক প্রতিষেধক তৈরি করতে। এর মধ্যে অন্যতম প্রাকৃতিক প্রতিষেধক হতে পারে ভাইটামিন-সি, গবেষকরা এমনি ভাবছেন।

ভাইটামিন-সি এমন একটি পুষ্টি উপাদান যা মানুষের শরীর তৈরি করতে পারেনা, তাই তাকে ভাইটামিন-সি গ্রহণ করতে হয় খাদ্য উপাদান থেকে। ভাইটামিন-সি এন্টিঅক্সিডেন্ট (যা কোষের জারণ বিক্রিয়া প্রতিহত করে যেটি চেইন বিক্রিয়ার মাধ্যমে মুক্তমূলক তৈরি করে কোষের ক্ষতিসাধন করে) হিসেবে কাজ করে বা, অন্যান্য এনজাইমের প্রভাবক হিসেবে কাজ করে।  ভাইটামিন-সি আমাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ৮৫% পর্যন্ত বাড়াতে পারে। ভাইটামিন-সি অভাবে স্কার্ভি (মুখের ঘা) রোগ হয় যা ১৮৮৩ সালে ব্যাখ্যা করা হয়। এর আগেও ১৬ শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ফ্রেঞ্চ নাবিকেরা সিডার ফলের চা পান করে স্কার্ভি থেকে মুক্তি পেয়েছিল, পরবর্তিতে দেখা যায় সিডার ফলের প্রতি ১০০ গ্রামে ৫০ মিলিগ্রাম ভাইটামিন-সি থাকে। ওই সময়টাতে নাবিকেরা যখন মাস কিংবা বছরের পর বছর সমুদ্রে কাটাত তখন তাদের খাবারগুলোর মধ্যে ছিল শুকনো ফলমূল, সবজি  বা লবনমিশ্রিত মাংশ। নাবিকেরা তখন প্লেগ (plague) রোগে আক্রান্ত হত। অবশেষে আঠারশ শতাব্দীতে শুরুতে নাবিকেরা বুঝতে পারল সাইট্রাস ফলের জুসে, যা কিনা ভাইটামিন-সি  এ ভরপুর, প্লেগের প্রকোপ কমে যায়। দেখা যায় যেঁ প্রাচীন মিসরীয়রাও তেঁতুলের রসকে (যাতে প্রচুর ভাইটামিন-সি রয়েছে) ব্যবহার করত কোষ্টকাঠিন্য দূর করতে। এই রোগগুলা ছাড়াও ভাইটামিন-সি আরো অসংখ্য রোগের সমাধানে কাজ করে বলে প্রমান পাওয়া যায়।

 

স্কার্ভির চিকিৎসায় সাইট্রাস ফল।
চিকিৎসায় সাইট্রাস ফল।

দেখা যাচ্ছে ভাইটামিন-সির নানাবিধ রোগের চিকিৎসায় মানুষ ব্যবহার করে আসছে প্রাচীন কাল থেকেই। আধুনিক সময়ে মানুষ জানে কিভাবে ভাইটামিন-সি বিভিন্ন রোগের নিরাময়ে কাজ করে বা খুঁজে বের করছে সাম্ভাব্য কোন কোন রোগে ভাইটামিন-সি কার্যকরি প্রতিষেধক হতে পারে। উচ্চ মাত্রার ভাইটামিন-সির ইন্ট্রাভেনাস ইনজেকশন যদি ক্যান্সার রোগীদের মধ্যে দেয়া হয় তা ক্যান্সার রোগীদের আরোগ্য লাভে সহায়তা করে, ১৯৭০ এর দশকে স্কটীশ বিজ্ঞানী ইওয়ান ক্যামেরন ও নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী লিনাস পউলিং তা ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখতে পারেন। পরবর্তিতে কিছু গবেষণা দেখিয়েছে সম্ভবত ভাইটামিন-সি ক্যান্সার কোষকে সরাসরি ধ্বংস করতে সহায়তা করে। বলে রাখা দরকার উচ্চ মাত্রার ভাইটামিন-সির ইন্ট্রাভেনাস ইনজেকশন নেয়া রোগীদের মধ্যে বিভিন্ন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায় যেমন- কিডনি বিকল হওয়া।  বিভিন্ন ক্যান্সারে কিভাবে ভাইটামিন-সি একটি সফল প্রতিষেধক তার কিছু উদাহরন নিচে দেয়া হল।

১। ভাইটামিন-সি ও সুলিন্ডাক (ক্যামিক্যাল যা কিনা অস্বাভিক কোষ বিভাজন প্রতিহত করে) মেশানো ক্যান্সার থেরাপি মানুষের কোলন ক্যান্সার প্রতিরোধে কাজ করে মানুষের ক্যান্সার রোধক জিন p53 এর কার্যকারিতা বাড়িয়ে। (Gong EY et. al. Toxicol Lett. 2016 Jun 20)

২। ১৮ টি ভিন্ন গবেষণার তথ্য নিয়ে দেখা গেছে খাবারে ভাইটামিন-সির পরিমাণের সাথে অগ্নাশয়ের ক্যান্সারে বিপরীত সম্পর্ক রয়েছে। (Chen J et. al. Int J Food Sci Nutr. 2016 Jun 30:1-13)

৩। ৫০-৬০ বছর বয়সী ৫৫ জন স্তন ক্যান্সারের মহিলার পরীক্ষা করে দেখা গেছে তাদের শরীরে অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের সাথে ভাইটামিন-সির পরিমাণ অত্যন্ত কম। (Custódio ID et. al. PLoS One. 2016 Jun 16;11(6):e0157113)

৪। ২০০৭ সালে বিশ্ব ক্যান্সার গবেষণা ফান্ড ঘোষণা করে যেসব খাবারে ভাইটামিন-সি আছে তারা খাদ্যনালীর ক্যান্সার প্রতিরোধ করে ও ফলমূল সম্ভবত গ্যাস্ট্রিক ক্যান্সারের বিরুদ্ধে কাজ করে। ১,০৫৭ রোগীর মধ্যে দেখা গেছে দৈনিক প্রতি ১০০ গ্রাম সাইট্রাস ফলের গ্রহণ বৃদ্ধি করলে খাদ্যনালীর ক্যান্সারের প্রকোপ কমে যায়। (Vingeliene S et. al. Cancer Causes Control. 2016 Jul;27(7):837-51)

৫। অনেক জিনের প্রকাশ পরিবেশের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয় (DNA methylation বা অন্য এপিজিনোমিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে)। মেলানোমাতে (ত্বকের ক্যান্সার) দেখা যা কিছু জিনের 5-hydroxymethylcytosine (5hmC) এর পরিমান কমে গিয়ে ক্যন্সার ঘটায়। TET2 জিনের মাধ্যমে 5-hydroxymethylcytosine (5hmC) এর পরিমান স্বাভাবিক মাত্রায় নিয়ে এসে কমানো যায় এই ক্যান্সারের প্রকোপ। আর TET2 জিনের কার্যকারিতার জন্য অতিপ্রয়োজন ভাইটামিন-সির উপস্থিতি। (Gustafson CB et. al. Clin Epigenetics. 2015 Apr 29;7(1):51)

দেখা যাচ্ছে আমাদের খাদ্য তালিকায় প্রতিদিন যদি ভাইটামিন-সি অর্থাৎ কমলা, লেবু, টমেটো বা শাকসবজি থাকে, তাহলে মন্দ হয়না।

 

রাশেদুল ইসলাম

জুলাই ৫, ২০১৬

 

July 5, 2016

0 Responses on ভাইটামিন-সিঃ ক্যান্সারের প্রাচীন প্রতিষেধক"

Leave a Message

PromisesBD ©. All rights reserved.

Powered by themekiller.com